গোলমেলে পাঠ্যবই—২ সম্পাদকদের না জানিয়ে পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন

গোলমেলে পাঠ্যবইগোলমেলে পাঠ্যবইপাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন আনতে চাইলে বইয়ের সম্পাদককে তা জানতে হবে। বানান, যতিচিহ্ন ও বিরামচিহ্নের মতো ছোটখাটো ভুলের জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) বিশেষজ্ঞরা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু কোনো লেখা বাদ দেওয়া বা যুক্ত করার জন্য জাতীয় পাঠ্যক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) অনুমোদন এবং সম্পাদকের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক।
কিন্তু চলতি বছরের পাঠ্যবইয়ে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা বইয়ের সম্পাদক, রচয়িতা ও সংকলকদের না জানিয়ে করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা বইয়ের মোট ২৩ জন সম্পাদক ও সংকলকের মধ্যে ১১ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাঁদের ১০ জনই বলেছেন, পরিবর্তনের বিষয়টি তাঁরা জানতেন না। মন্তব্য করতে চাননি সরকারের একজন কর্মকর্তা।
এবারের পাঠ্যবইয়ে ভুলভ্রান্তির পাশাপাশি বিতর্ক সৃষ্টি করেছে নতুন লেখা যোগ করা ও পুরোনো লেখা বাদ দেওয়ার বিষয়গুলো। বিশেষ করে হেফাজতে ইসলামের সুপারিশ অনুযায়ী ১৭টি লেখা যুক্ত করা ও ১২টি লেখা বাদ দেওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এনসিটিবির নীতিনির্ধারণী কর্মকর্তারা বলেছেন, উদ্ভূত পরিস্থিতি ও সমালোচনার কারণে সম্পাদকদের কেউ কেউ হয়তো বিব্রত। কিন্তু এ পর্যন্ত কেউ কোনো আপত্তি তোলেননি। লিখিতভাবে কেউ দ্বিমতও পোষণ করেননি।
তবে সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দায় এড়াতে পারেন না বলে মনে করেন লেখক ও শিক্ষাবিদদের অনেককেই। দৃষ্টান্ত হিসেবে তাঁরা বলেন, যেকোনো প্রকাশনার দায়দায়িত্ব এর সম্পাদকের। পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ সেখানে সম্পাদক, লেখক, রচয়িতা ও সংকলকদের সঙ্গে এনসিটিবির চুক্তি হয়। এ কাজের জন্য তাঁরা সম্মানির নামে টাকাও পান। এ ছাড়া কোটি কোটি বইয়ে তাঁদের নাম থাকে।
সম্পাদক, রচয়িতা ও সংকলকদের প্রায় সবাই এখন বলছেন, পাঠ্যবইয়ে তাঁদের নাম উল্লেখ আছে ঠিকই। কিন্তু পরিবর্তন বা পরিমার্জনের বিষয়গুলো তাঁরা মোটেও অবগত নন।
ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিতে সম্পাদক, রচয়িতা ও সংকলক আছেন ১০ জন করে। তাঁদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহবুবুল হকের নাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ২০১৩ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত সংশোধন বা পরিমার্জন যাই হোক না কেন, তাঁকে কিছুই বলা হয়নি।
জানতে চাইলে অধ্যাপক মহাম্মদ দানীউল হক প্রথম আলোকে বলেন, অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে কয়েকজন মিলে বইটি চূড়ান্ত করে দেওয়ার পর গত তিন বছরে তাঁর সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি। তাই কী পরিবর্তন বা সংযোজন হচ্ছে, তা তিনি জানেন না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা কেউই এই পরিবর্তনের বিষয়টি জানি না। আমাদের নাম ব্যবহার করে এবং আমাদের কিছু না জানিয়ে পরিবর্তন আনাটা খুবই দুঃখজনক। সংবাদমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করার কথা ভাবছি।’
এই ১০ জনের নামের তালিকায় থাকা অধ্যাপক সরকার আবদুল মান্নান এখন এনসিটিবির একজন সদস্য। তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেন, পরিবর্তন বা পরিমার্জনের বিষয়ে কেউ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। কীভাবে এগুলো হয়েছে তা জানেন না।
তবে লেখক ও শিক্ষাবিদদের কেউ কেউ বলছেন, সম্পাদকেরা না জানলেও তাঁরা এর দায় এড়াতে পারেন না। তা ছাড়া কোটি কোটি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা জানছেন যে, তাঁরাই বইয়ের সম্পাদক বা সংকলক।
 জানতে চাইলে লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ প্রথম আলোকে বলেন, দল নিরপেক্ষ শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের কমিটি করে তাঁদের সামনে পাঠ্যবইয়ের সম্পাদক বা সংকলকদের গণশুনানি হওয়া দরকার। তা না হলে মানুষ ধরে নেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের অলিখিত সম্মতি নিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে এই জাতি ধ্বংসকারী কাজ করা হয়েছে।
ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সম্পাদক বা সংকলকদের কেউ বিষয়টি জানেন না, এটা হতে পারে। তবে এ পর্যন্ত কেউ প্রতিবাদ করেছেন বলেও শুনিনি। এ জন্য তাঁদের এই বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। সম্পাদকেরা বই করে দেওয়ার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা এনসিটিবি যাচ্ছেতাই পরিবর্তন ও ভুল করবে। এটা মেনে নিতে হবে কোন যুক্তিতে?’
এনসিসিসি জানে না!
পাঠ্যবই পরিবর্তন ও পরিমার্জনের কাজগুলো করার জন্য রয়েছে এনসিসিসি। মাধ্যমিক স্তরের জন্য শিক্ষাসচিবের (বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব) নেতৃত্বে এবং প্রাথমিক স্তরের জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি কাজ করে। এই দুই কমিটির বেশ কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরাও পরিবর্তনের বিষয়গুলো জানেন না।
এনসিসিসির সদস্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, পত্রিকায় প্রকাশিত খবর দেখে তিনি বিষয়টি জানতে পারেন। এনসিসিসির সভায় কোনো লেখা যুক্ত করা বা বাদ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়নি। তাঁর মতে, এভাবে বইয়ে পরিবর্তন আনাটা উদ্ভট সিদ্ধান্ত।
এনসিসিসির সদস্য এবং জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য শাহীন কবীর বলেন, এসব পরিবর্তনের বিষয় তিনি অবহিত নন। তাঁর মতে কাজগুলো পেশাদারির সঙ্গে হয়নি।
এনসিসিসির সভাপতি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন এসব বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি। তিনি বলেন, যেসব আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে সেগুলো সমন্বয় করে আগামী বছরের পাঠ্যবইয়ে অধিকতর গ্রহণযোগ্যতা আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মদ কায়কোবাদ প্রথম আলোকে বলেন, পাঠ্যবইয়ে কার নির্দেশে, কোন প্রয়োজনে এবং কোন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনগুলো এসেছে, তার পরিষ্কার ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। তিনি বলেন, কেউ কেউ বলছেন তড়িঘড়ি করার কারণে ভুলত্রুটি হয়েছে। কিন্তু এটা তড়িঘড়ি করার মতো বিষয় নয়।
ট্রাই-আউটের নামে পরিবর্তন
পাঠ্যবই পরিমার্জনের জন্য ট্রাই-আউট (প্রান্তিক পর্যায়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা কমিটি ও অভিভাবকদের মত নেওয়া) পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। কিন্তু পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তন অনিবার্য হলে শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করতে হয়।
বর্তমান শিক্ষাক্রম তৈরি হয় ২০১২ সালে, পাঠ্যবই ছাপা হয় ২০১৩ সালে। সাধারণত প্রতি পাঁচ বছর পর পাঠ্যবই পরিবর্তন করা হয়।
এনসিটিবি সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে নতুন পাঠ্যবই প্রকাশের পর থেকে ট্রাই-আউট শুরু হয়। এরপর থেকে টুকটাক পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু এবারই বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তন কীভাবে হলো, সে সম্পর্কে শিক্ষা প্রশাসনের কাছ থেকে সুস্পষ্ট জবাব পাওয়া যায়নি। ট্রাই-আউটে এসব পরিবর্তনের বিষয়টি যেমন আসেনি, তেমনি এনসিসিসির বৈঠকেও এসব বিষয় চূড়ান্ত হয়নি। সে ক্ষেত্রে এনসিসিসির ভূমিকা এবং ট্রাই-আউট পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ট্রাই-আউটের যুক্তি হিসেবে এনসিটিবির চেয়ারম্যান নারায়ণ চন্দ্র সাহা বলেন, ২০১৩ শিক্ষাবর্ষে দেশের ৭ বিভাগের ৩২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ট্রাই-আউট করা হয়। এর মাধ্যমে পাওয়া ফল এবং পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তু ও চিত্রসমূহ অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিষয়বস্তু পরিমার্জন করা হয়। মাধ্যমিকের বইও সংশোধন ও পরিমার্জনের মাধ্যমে ত্রুটিমুক্ত করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
লেখকের নাম মুছে ফেলা হয়েছে
প্রবীণ অধ্যাপক শফিউল আলম এনসিটিবির বিশেষজ্ঞ ছিলেন। কিন্তু তাঁর লেখা ছাপা হলেও নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। ১৯৯৭ সালে শিশু একাডেমীর শিশু পত্রিকায় (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) তাঁর ‘শহিদ তিতুমির’ লেখাটি ছাপা হয়। এরপর ২০০৫ সালে লেখাটি পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ে প্রথম ছাপা হয়।
শফিউল আলম বলেন, ‘আমি ওই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছি। বিষয়টি নিয়ে আমি বিব্রত। হয়তো নাম দিতে ওনারা অসম্মানবোধ করেছেন।’
এনসিটিবি সূত্র জানায়, শফিউল আলমের আরও দুটি লেখা ছাপা হয়েছে নাম ছাড়া। এগুলো হচ্ছে শখের মৃৎশিল্প ও মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।
সম্মানীর নামে অসম্মান করা
পাঠ্যবইয়ের বিশাল কাজের জন্য সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মানী খুবই কম। একজন সম্পাদক বা সংকলক পেয়ে থাকেন ৫ থেকে ১৫ হাজার টাকা। সম্মানীর পরিমাণ কম হওয়ায় অনেকেই এনসিটিবির কাজ করতে চান না। ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন ২০১৩ সালে সম্মানী প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। পরে তাঁর সম্মানী কিছুটা বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
মুনতাসীর মামুন বলেন, যোগ্য লোককে দিয়ে ভালো কাজ করাতে চাইলে যোগ্যতা অনুযায়ী সম্মানী দিতে হবে। এনসিটিবির সেই সামর্থ্য আছে। বছরে হাজার কোটি টাকার কাজ করে লেখক বা সম্পাদককে অসম্মান করার মানে নেই।
mongsai79@gmail.com

Comments